সংবাদ শিরোনামগুলো
>>ডাকাত বা লুটেরারা বদমাইশ কিন্তু তাদের সর্দারনী নিষ্পাপ!>>শেখ হাসিনাও সৌজন্য শেখাচ্ছেন!>>শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে বললেন মির্জা ফখরুল>>৪ মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ বিবৃতি: গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন>>বিতর্কিত গণকমিশন ও ঘাদানিকের সাথে জড়িতদের আয়ের উৎস খুঁজতে দুদকে স্মারকলিপি>>লুটেরাদের ডলার লুটে টাকার মান কমল আরেক দফা>>আলেমদের বিরুদ্ধে তথাকথিত কমিশনের শ্বেতপত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতা- সর্বদলীয় ওলামা ইউকে>>আওয়ামী লুটেরাদের ডলার লুট>>শেখ হাসিনার অধিনে কেউ ভোটে যাওয়ার চিন্তা করলে ভুল করবে-শামসুজ্জামান দুদু>>অবশেষে গডফাদার খ্যাত হাজী সেলিম কারাগারে: কতটা দ্রুততায় জামিন মঞ্জুর হয় সেটাই দেখার বিষয়

“ঘর ওয়াপসী”

, ,

আরিফুল হক

চরম সাম্প্রদায়িক দল ভারতের আরএসএস দর্শন ও নীতির অনুসারী বিজেপি এখন ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এই বিজেপি দলের মূল এজেন্ডা হচ্ছে, ১) ১৯৪৭ সাল পূর্ব অখণ্ড হিন্দু ভারত গঠন। ২) ‘ঘর- ওয়াপসী’। অর্থাৎ মুসলমান আগমনের পূর্বে এদেশে হিন্দুদের বাস ছিল, সুতরাং ভারতে বসবাসকারী সকলকে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেই ভারতে বাস করতে হবে।

কিছুদিন আগে (সময়টা ঠিক মনে নেই) ভারতীয় দূরদর্শনের ‘খাস খবর’ অনুষ্ঠানে একটি খবর খুব খাস করে প্রচারিত হয়েছিল। খবরটা অনেকের মনে থাকতে পারে। চিত্র সংবাদটি ছিল এরকম— কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের আর্যসমাজ মন্দিরের একটি স্থানে শুদ্ধি-যজ্ঞের হোমানল দাউদাউ করে জ্বলছে। তার পাশে বসে আছে একটি মুসলিম পরিবারের ছয় জন সদস্য। টিভি সাংবাদিক, আর্যসমাজের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলেন, হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে এই পরিবারটি শুদ্ধি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বইচ্ছায় হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করলো। টিভি সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, হিন্দুধর্ম গ্রহণ করায় ওরা কোন কাস্ট বা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হবে- মাহ্মন, কায়স্থ না শূদ্র? প্রশ্ন শুনে আর্যসমাজী নেতাদের কেউকেউ রেগে গিয়ে বললো। অবান্তর প্রশ্ন— ওরা আমাদের প্রচারে মুগ্ধ হয়ে, স্বইচ্ছায় হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে এটাই বড় খবর বাদবাকি সব অবান্তর। চিত্র সাংবাদিক পরিবারটির সাথে দেখা করার অনুমতি চাইলে, বিশ্বহিন্দু পরিষদের এক নেতা বললেন, ওদের নিরাপত্তার জন্য আমরা ওদের পরিচয় এবং অবস্থান গোপন রাখতে চাই। পুলিশ বাহিনীও বিশ্বহিন্দু পরিষদের পাশে দাঁড়ালো।

পুলিশ টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং এশিয়ান এজ পত্রিকাকে জানালো যে , কলেজষ্ট্রীটের কাছে, ৪২ নং শঙ্কর ঘোষ লেনে অবস্থিত বঙ্গীয় আর্য প্রতিনিধি সভায় যে সব মুসলমানদের হিন্দু করা হয়েছে, তারা স্বইচ্ছায় হিন্দুধর্মকে আপন করে নিয়েছে, এতে প্রতারণার বা জবরদস্তির কোন ব্যাপার নেই।
কয়েকদিন পরই কলকাতার ‘কলম’ পত্রিকার এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানা গেল যে এই হিন্দু করনের কাহিনী সম্পূর্ণ ব্লাকমেলিং, প্রতারণামূলক এবং মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতিবেদনটিতে বেরিয়ে আসে যে পরিবারটির প্রধানের নাম মুন্না জমাদার বলে প্রচার করা হলেও তার আসল নাম মান্নাফ জমাদার। তার বাড়ী মালদহ বলে প্রচার করা হলেও, আসলে তার বাড়ী, ২৪পরগনা জেলার মগরাহাট থানার মোল্লার চক গ্রামে। মান্নাফ জমাদারের স্ত্রী জয়নব বিবি, এবং চার ছেলে মেয়ে, যথাক্রমে মোজাফর আহমদ (১৪), খাদিজা খাতুন (১১), আমিনা খাতুন (৮), ফাহাদ হোসেন (৬), এরা স্বেচ্ছায় হিন্দু ধর্ম পালন করেছে প্রচার করা হলেও, এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। কলম পত্রিকার প্রতিনিধির কাছে মান্নাফ জমাদার ও জয়নব বিবি দৃঢ়তার সাথে বলে যে, তারা মোটেও ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেনি। তাদের কাজ দেয়া হবে বলে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে আর্যসমাজের লোকেরা জবরদস্তি করে ধর্মান্তর করার চেষ্টা করে।

সারা ভারত জুড়ে মুসলমানরা যে কত রকম উপায়ে নির্যাতিত হচ্ছে তার হিসাব কেউ রাখেনা! তাদের কান্না শোনার জন্যও কেউ নেই। ভারতে এখন নাজীবাদের মত হিন্দুত্তবাদী সংঘ রাজ্য চলছে। যাদের আদর্শ এবং উদ্দেশ্য হল হিন্দুত্তবাদ প্রতিষ্ঠার নামে ভারতে ফ্যাসিবাদ, নাজীবাদ, পুঁজিবাদ ও ব্রাহ্মন্যবাদ কায়েম করা। এই ফ্যাসিবাদী সংঘরাজ্যের অঙ্গদল আর এস এস, বি জে পি, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য শুধু নয়, দুই পাশের দুই মুসলমান রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করার জন্য নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যেটা সম্পর্কে বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং জনগণ কেউই সচেতন নয়!

বিগত Oct 2000, p-44 তাং “Ajke Surekh Bharat” নামে একটা লোমহর্ষক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল । “Some days ago a poisonous RSS’s secret agenda document was leaked by mistake and as such the fact of RSS’s inner vicious mind has been exposed.” প্রতিবেদনটি সাপ্তাহিক ‘ New age’ পত্রিকা, এবং কম্যুনিস্ট পার্টির কালান্তর পত্রিকা (১৮-২৪ জুন ২০০০) সংখ্যাতেও প্রকাশিত হয়। উক্ত পত্রিকায় লেখা হয়েছিল-
“This agenda doesn’t bear any date and signature. The agenda code number is – 411/ND/3003/R.S.S. – C.O. Dear missionary brothers – according to this agenda, we are giving you responsibilities and as such we request you to accomplish the same. You memorize the agenda by heart and later on, tear it off. This work must be done confidentially and excellently.”

পত্রিকাগুলোতে ফাঁস হওয়া সার্কুলারটির ৩৪ টি এজেন্ডা , কত হীন, ষড়যন্ত্র মূলক, অমানবিক, এবং সাম্প্রদায়িক, তা ভাবতে গেলে মানুষ হিসাবে নিজেকে ছোট মনে হয়। সার্কুলারটি এখানে তুলে ধরা হল-
১) মুসলমান এবং দলিত দের হত্যা করার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহের কাজ কে তীব্রতর করতে হবে।
২) মুসলমান ও আম্বেদকর পন্থীদের সাথে লড়বার জন্য নিম্নবর্ণ ও পশ্চাৎপদ মানুষদের আমাদের দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
৩) সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে হিন্দুত্বের আদর্শ প্রচারকে তীব্রতর করতে হবে যাতে তারা মুসলমান এবং দলিতদের ক্ষতি করতে পারে।
৪) ডাক্তার এবং ওষুধ নির্মাতাদের মধ্যে হিন্দুত্বের আদর্শ, প্রচার করতে হবে এবং নিম্নবর্ণের মানুষ ও মুসলমানদের মধ্যে ভেজাল ও তারিখ উত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করতে তাদের সম্মত করতে হবে। এবং তাদের সদ্যজাত শিশুদের ইনজেকশন দিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুতে পরিণত করতে হবে। এই কাজ করতে হবে তাদের বসবাসের অঞ্চল গুলোতে স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির সংগঠিত করার বাতাবরণে।
৫) মুসলমান এবং দলিতদের অঞ্চলে গিয়ে তাদের ধরেধরে সঠিকভাবে ‘ওম’ ও ‘জয় শ্রীরাম’ উচ্চারণ শেখাতে হবে।
৬) যারা হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কথা বলবে বা মন্তব্য করবে, তাদের বয়কট এবং ভয় দেখাতে হবে !
৭) মুসলমান এবং দলিতদের মধ্য ড্রাগ,মদ,জুয়া, বেশ্যা আসক্তি, লটারিসহ আরও যত খারাব অভ্যাস আছে সেগুলো বাড়িয়ে তুলতে হবে ।
৮) মুসলমান ছেলেরা যারা স্কুলে পড়ে, তাদের মধ্যে এমন ক্ষতিকর খাবার পরিবেশন করতে হবে যে তারা যেন মানসিক এবং শারীরিক ভাবে প্যারালাইজড হয়ে পড়ে।
৯) দলিত এবং মুসলমান মেয়েদের কলগার্ল এবং বেশ্যাবৃত্তিতে আসক্ত করে তুলতে হবে।
১০) সমস্ত স্কুলে হিন্দুত্বের সপক্ষে মিথ্যা ইতিহাস শেখাতে হবে।
১১) রায়ট লাগিয়ে মুসলিম খৃষ্টান দলিত মেয়েদের গণহারে ধর্ষণ করতে হবে ।
১২) রায়টে উস্কানি দিয়ে সরকারি বাহিনীর সহায়তায় মুসলিম, দলিতদের হত্যা করতে হবে।
১৩) আজকের মসজিদগুলির সবগুলিই প্রায় অতীতে হিন্দু মন্দির ছিল, এমন ইতিহাস রচনাকরে ছড়িয়ে দিতে হবে ।
১৪) বিশেষ করে মুসলমানদের দুর্নাম করে ইতিহাস সাহিত্য রচনা করতে হবে।
১৫) ব্রাহ্মনদের হেয়ে করা হয়েছে এমন সাহিত্য ইতিহাস ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
১৬) স্ক্যার্প রেকর্ড তৈরি করে মুসলমান, দলিত, ওবিসিদের চাকরীর ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত করতে হবে!
১৭) ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুলোয় হিন্দু দেবদেবীর অলৌকিক বিষয় সমূহ বারবার প্রচার করতে হবে।
এরকম ৩৪টি নির্দেশনামা সার্কুলারটিতে দেয়া হয়েছে। স্থানাভাবে সবগুলো তুলে ধরা সম্ভব হলনা। যেমন ২০নং এজেন্ডায় বলা হয়েছে ইসলামি ধর্মপ্রচারক, এবং খৃষ্টান মিশনারিদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখতে হবে । ২৮নং এজেন্ডায় বলা হয়েছে মুসলিম দলিত ওবিসিদের হাই ফাই ইলেকট্রনিক মিডিয়া যথা আই টি, ইন্টারনেট, কম্প্যুটার সায়েন্সে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে। ২৯ নং এজেন্ডায় আছে , মুসলিম ও দলিত লেখকদের টাকা পয়সা বা অন্যান্য পদক পুরস্কার দিয়ে দলে টেনে তাদের দিয়ে ইসলাম বিরোধী সাহিত্য রচনা করাতে হবে । সার্কুলারটি শেষ করা হয়েছে এইভাবে— “Preach Hindutva in chanting the slogan of Jai Shriram relentlessly. (Note.: Memorize the above-said by heart and burn this agenda paper)”

ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার চাদরে গাঢাকা দিয়ে এক অসভ্য সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের দিকে ভারতের জনগণ কে টেনে নিয়ে গেছে। ভারতের ৩০কোটি মুসলমান আজ হিন্দুত্ববাদের কৃপার উপর ভর করে বেঁচে আছে। বাংলাদেশ ১৭ কোটি মুসলমানের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হওয়ার পর ও কি আর এস এস এর হিন্দুত্ববাদের কালো থাবার বাইরে থাকতে পেরেছে। ৯১% মুসলমানদের দেশে, ইসকন আছে, হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্যপরিষদ আছে, কিন্তু ইসলামি দলগুলো কার্যত নিষিদ্ধ তালিকা ভুক্ত। দাঁড়ি টুপী পরা মানুষ এবং হিজাবি মহিলাদের সকল স্থানে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। বিভিন্ন নেশা দ্রব্য ও ড্রাগ ব্যবসার সাথে সরকারি হোমরা চোমরারা জড়িত। মদ নিষিদ্ধের মুসলমান দেশে আজ ১৮ বছর বয়স হলেই মদ্যপানের লাইসেন্স উন্মুক্ত করা হয়েছে ।দেশের প্রায় সকল খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল। দেশের নদী, বন্দর, ট্রানজিটের নামে পথঘাট সব কিছু সাম্প্রদায়িক ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। শিক্ষা সিলেবাসে আর এস এস এর১৪নং ধারাটি অনুসরণ করা হচ্ছে, দেশে প্রায় দু’লক্ষ ভারতীয় বিভিন্ন পদে চাকরী করছে, অথচ আইএলও প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৩কোটি মানুষ বেকার। এটাকি স্বাধীনতা না পরাধীনতা? এটাকি বন্ধুত্ব না দাসত্ব। কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে মেতে আছে বাংলাদেশ। এসব কথা ভেবে দেখার সময় কি বাংলাদেশের মানুষের এখনও হয়নি? আমরা তো এইসব আরএসএস বিজেপি জনসংঘ ওয়ালাদের সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, দু’শ বছর লড়াই সংগ্রাম করে মুসলিম স্থান হিসাবে পাকিস্তান পরে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিলাম। আজ সেই বাংলাদেশে মুসলমানরাই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে বাস করছে কেন? তবে কি তারা আর এস এস দর্শন ‘ঘর ওয়াপসী’ কেই মেনে নিল?

লেখক: কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী ও প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Leave a Reply