সংবাদ শিরোনামগুলো
>>ডাকাত বা লুটেরারা বদমাইশ কিন্তু তাদের সর্দারনী নিষ্পাপ!>>শেখ হাসিনাও সৌজন্য শেখাচ্ছেন!>>শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে বললেন মির্জা ফখরুল>>৪ মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ বিবৃতি: গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন>>বিতর্কিত গণকমিশন ও ঘাদানিকের সাথে জড়িতদের আয়ের উৎস খুঁজতে দুদকে স্মারকলিপি>>লুটেরাদের ডলার লুটে টাকার মান কমল আরেক দফা>>আলেমদের বিরুদ্ধে তথাকথিত কমিশনের শ্বেতপত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতা- সর্বদলীয় ওলামা ইউকে>>আওয়ামী লুটেরাদের ডলার লুট>>শেখ হাসিনার অধিনে কেউ ভোটে যাওয়ার চিন্তা করলে ভুল করবে-শামসুজ্জামান দুদু>>অবশেষে গডফাদার খ্যাত হাজী সেলিম কারাগারে: কতটা দ্রুততায় জামিন মঞ্জুর হয় সেটাই দেখার বিষয়

বাংলাদেশের সংস্কৃতি

, ,

আরিফুল হক

সংস্কৃতির সাথে সভ্যতার এবং সভ্যতার সাথে জাতিসত্তার একটা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির খবর জানতে হলে বাংলাদেশে বসবাসকারী মানুষের জাতীয় পরিচয় জানা জরুরী।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার, ৫৫,৪১৩ বর্গমাইল আয়তনের এই দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭কোটির মত। যার মধ্যে প্রায় ৯০% মুসলিম। বাকি ১০% হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বাস। একক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারনেই, ১৯৪৭ সালে বৃটিশ-উপনিবেশকারীদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় দেশটি সেসময়কার মুসলিম দেশ পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে পূর্বপাকিস্তান নাম নেয়। পরে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে, আলাদা রাষ্ট্র বাংলাদেশ নাম ধারণ করে।

১৯৭১ সালের আগে এদেশের মানুষের জাতীয় পরিচয় ছিল ‘পাকিস্তানি’ জাতি। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশটি নবজন্ম লাভের অর্দ্ধশতাব্দী পরও তাদের জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ হলনা। একদল বলছে আমরা হাজার বছরের ‘বাঙালী’ জাতি। অতএব ‘বাঙালী’ আমাদের জাতীয় পরিচয়। কিন্ত সরকার প্রদত্ত পরিচয়পত্রে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে যারা বাস করে তাদের জাতীয় পরিচয় ‘বাংলাদেশী’।

এই বাঙালী এবং বাংলাদেশী জাতিসত্তার বিশৃঙ্খল পরিবেশের দরুন, দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিও বিশৃঙ্খল, দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এবং এই দিশাহীন সংস্কৃতি উলঙ্গ পড়শী সংস্কৃতির সম্মোহনের সেলসিয়াসে ভর করে এগুচ্ছে যা একটি জাতির জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ।

ঐতিহাসিক আর্নন্ড টয়েনবি বলেছিলেন, কোন ভূঁইফোড় বা পরিচয়হীন জাতির নিজস্ব কালচার বা সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারেনা। তবেকি বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ ভুঁইফোড় জাতি? ১৯৭১ সালে কি এই জাতিটার জন্ম হয়েছে?
বাংলাভাষায় কথা বলার জন্য এদেশের কিছু মানুষ একসময় নিজেদের বাঙালী বলে পরিচয় দিতেন বটে, কিন্তু এরা যে বাঙালী জাতি, তা তাদের নিজেদেরও জানা ছিলনা। কারন জাতি হিসাবে গড়ে উঠতে হলে, তাদের স্বাধীনতা থাকতে হয়, সার্বভৌম দেশের মালিক হতে হয়। বাংলাভাষীরা কোনদিন স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মালিক ছিলনা। তাই বাঙালী জাতিও গড়ে ওঠেনি।

তবে কি বাংলাদেশের ১৬কোটি মুসলমানের কোন জাতীয় পরিচয় নেই? কিংবা ৭১ এর আগে কোনদিন ছিলনা?

ইতিহাসের পথ ধরে এগুলে আমরা দেখবো, পাক ভারত বাংলাদেশ উপমহাদেশে, ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে, হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর ইসলাম প্রচারের যুগেই। বিশ্বকোষ ১৪ তে বলা হয়েছে যে ‘ভারতের চেরর (কেরল) রাজ্যের রাজা চেরুমান পেরুমল স্বইচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করিয়া মুসলমান ধর্ম গ্রহণের অভিলাষে মক্কা নগরী গমন করেন’।

জৈনুদ্দিন মখদুম প্রণীত তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ‘একজন হিন্দু রাজা মক্কা গমন করেন এবং হজরত মোহাম্মদ (সঃ) কাছে উপস্থিত হয়ে স্বেচ্ছায় মুসলমান হন’।

তাছাড়া সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ বইতে লিখেছেন, ‘মালাবার রাজাদের মধ্যে চেরুমান পেরুমলই প্রথম ইসলামধর্ম গর্হণ করে’। শ্রী সুরজিৎ দাসগুপ্ত উক্ত বইতে আরও উল্লেখ করেছেন, ‘বাম্ভ্রন্যধর্মের ব্যবহারিক জিনিষগুলোর চাপে কেরালার জনসাধারণ যখন মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয় ভুলতে বসেছে, তখন ইসলাম ধর্মের আগমন ও আহ্বান। এই আহ্বানে তারা প্রচণ্ড উৎসাহে সাড়াদিল এবং ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করলো’। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে ইসলাম প্রচারের সুবেসাদেক থেকেই এদেশে মুসলমানদের বসবাস।

ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের ন্যায় বঙ্গ অঞ্চলেও সুফি সাধকদের দ্বারাই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে সেই থেকেই। যেমন ধরা যায়, উত্তরবঙ্গে শাহ ইসমাইল গাজী (১৪৫৯-১৪৭৪খৃঃ) যিনি রাসূল (সাঃ) বংশধর ছিলেন। এছাড়া মখদুম শাহ গজনভী। চট্টগ্রামে ইরানী সূফীসাধক বায়েজিদ বোস্তামী (৮০৪-৮৭৪ খৃঃ)। ঢাকার শাহ মোহাম্মদ সুলতান রুমি (১০৫৩ খৃঃ) ও বাবা আদম শহীদ (১১৫৮-৭৯)। সিলেটের হজরত শাহজালাল ইয়েমেনী (১৩০৩)। রাজশাহীর শাহ মখদুম রূপোশ (১২৩৫)। উলুঘই আজম দিনাজপুর । সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী সহ আরও চল্লিশজন ইসলাম প্রচারক (‘চেহেল- গাজী’ নামে ইতিহাস প্রসিদ্ধ) যারা রংপুর দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন। সর্বজনমান্য উলুঘ খানজাহান আলি (১৩৬৯-১৪৫৯) যিনি দক্ষিণ বঙ্গে ইসলাম প্রচার করেন। এছাড়া আরও অগণিত শাসক বুজুর্গ শান্তিরদূত হিসাবে এদেশে এসে আপন চরিত্র-মাধুর্যে ও দৃঢ়তায় মুগ্ধকরে বঙ্গের মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। সুতরাং মুসলমানরা এদেশে কোন ভুঁইফোড় জাতি নয়।

ইসলামের সার্বিক সৌন্দর্যই মানুষকে যুগেযুগে ইসলাম গ্রহণে আকর্ষণ করেছে, যা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। সম্প্রতি ভারতের তামিলনাড়ুর বিখ্যাত মোটিভেশনাল স্পীকার এবং শিক্ষিকা মিসেস সবরিমালা যিনি সম্প্রতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফাতিমা নাম ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি কেন এই দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা। আমি একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসাবে কোরান পড়া শুরু করেছি। তারপর আমি সত্যটি জানলাম। এখন আমি ইসলামকে নিজের চেয়েও ভালবাসি”। তিনি আশেপাশের সবাইকে কোরানের সাথে পরিচিত করাবার জন্য মুসলমানদের অনুরোধ করেন । এবং বলেন, “তোমাদের বাড়িতেই লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর আশ্চর্যজনক বই, বিশ্বকে অবশ্যই এটি পড়তে হবে”।

ইসলামের এই ঐশ্বর্যময় গৌরবের ইতিহাস কোন প্রাগৈতিহাসিক কল্পকাহিনী বা মীথ নয়। খননকার্য চালিয়ে তা উদ্ধার করতে হবেনা। মুসলমানদের সভ্যতা সংস্কৃতির জাজ্বল্যময় উদাহরণ এখনও দেশময় জীবন্ত ঐতিহ্য হয়ে ছড়িয়ে আছে। অন্ধ যারা তারাই শুধু দেখতে পাচ্ছে না।

যারা বাঙালী সাজার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন তারা জেনে রাখুন, যে সকল অঞ্চল নিয়ে আজকের বাংলাদেশ গঠিত, সুদূর অতীতে এ অঞ্চলটি কোনদিন বঙ্গ কিংবা বাংলা নামে পরিচিত ছিলনা। আজকের বাংলাভাষীদের যে দুটি অঞ্চল, বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মাত্র দেড়-দুই হাজার বছর আগেও ৬টি জনপদে বিভক্ত ছিল। যাদের নাম ছিল, রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, বরেন্দ্র, রত্নদ্বীপ। এরমধ্যে বঙ্গ নামক জনপদটি গঠিত ছিল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ঢাকা, ২৪পরগনা এবং মুর্শিদাবাদ জেলার একাংশ নিয়ে। কাজেই সেই বঙ্গ ধরে বাঙালী সাজতে গেলে বাংলাদেশের সীমানা অন্যভাবে সাজাতে হবে।

তবে ঘটনাসূত্রে পাওয়া যায় যে ১৩৪২ সালের দিকে শামসুদ্দিন মহম্মদ ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) বাংলার পৃথক পৃথক অঞ্চলকে একীভূত করে নাম দেন ‘বাঙ্গালা’। নিজে শাহ-ই-বাঙালী নামে অভিহিত হয়ে রাজ্য শাসন করেন। তবে তাঁর রাজ্য ‘বাঙ্গালা’র বিস্তৃতি ছিল আসাম থেকে বারানসী পর্যন্ত। এখানেও মিলছেনা। ইলিয়াস শাহী বাংলা গড়তে গেলে তো আর একটা মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে। বাঙালী দাবিদাররা কি পারবেন তেমনটা করতে? এসব ইতিহাস ভূগোল ঘেঁটে লাভ নেই, কারন আজকের বাঙালীবাদীরা এসব পড়েওনা জানারও চেষ্টা করেনা।

বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয়তাবাদ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের বাবু শ্রেণীর, যেমন জমিদার মহেন্দ্র নন্দী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্র ব্যানার্জি প্রমুখ, এবং স্বদেশী আন্দোলনকারী ডাকাতদলের কাছ থেকে ধার করা বাঙালী জাতীয়তাবাদ। যাদের সম্বন্ধে বাবাসাহেব ডাঃ আম্বেদকর তাঁর ‘পাকিস্তান অর পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া’ বইতে বলেছেন, ‘বাঙালী হিন্দুদের (১৯০৫সালে) বাংলাবিভাগ বিরোধিতার প্রধান কারন ছিল, পূর্ববাংলার বাঙালী মুসলমান যাতে যোগ্যস্থান না পেতে পারে’। সুতরাং বলা যেতে পারে যে, প্রথম বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থানই ছিল বাংলার চাষীবাসী মুসলমানদের দাবিয়ে রাখা, পদানত করে রাখার বাঙালী জাতীয়তাবাদী উত্থান।

১৯৭০ সালের দিকে শেখ মুজিবের হাত ধরে ‘আমরা বাঙালী’ এবং বাঙালী সংস্কৃতির যে আওয়াজ ওঠেছিল তা ছিল ঐ বাবুশ্রেনীর কাছ থেকে ধার করা বাঙালী জাতীয়তাবাদ, এবং রবীন্দ্র-বঙ্কিমের কাছ থেকে ধার করা হিন্দু সংস্কৃতি। দীর্ঘদিন ধরে ভারত এদেশের মানুষকে পদানত রাখার জন্য নানান ভাবে স্লো-পয়জন করে আসছিল। কখনও দেশ দখলের রাজনীতির মাধ্যমে, কখনও শিক্ষা সংস্কৃতি ধংসের মাধ্যমে। দ্বিতীয় পথটিই তাদের কাছে উত্তম মনে হয়েছে। শিক্ষার নামে বহুত্ববাদী মনোভাব সম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা, এবং সংস্কৃতির নামে ইসলাম বিরোধী উলঙ্গ সংস্কৃতি দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়ে ৯০% মুসলমানকে ইসলামি আদর্শ চ্যুত করা। তারা মনে করে এদেশের মুসলমানদের ইসলামী শিক্ষা সংস্কৃতি ধংস করতে পারলে তাদের মুসলিম জাতিসত্তা মুছে যাবে, এবং সেভাবেই দেশটা এমনিতেই হিন্দুভারতের অধিকারভুক্ত হয়ে যাবে। ইসলামি আদর্শই বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা দেশ করে রেখেছে।

আজ বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আড়াই লাখ মসজিদের দেশে এখন পথে পথে মূর্তির ভাগাড়। জাতীয় টেলিভিশনে আল্লাহর বানী কোরান পাঠের পরই মানব লিখিত গীতা পাঠের মাধ্যমে কোরানের অবমাননা করা হচ্ছ। কিছু মানুষের জন্য বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলা নিষিদ্ধ। দেশরক্ষার সেনানীরা শিখা চিরন্তন নিশা অনির্বাণের আগুনের কাছে শপথ নিচ্ছে। মুসলমান মেয়েরা হিজাব পরলে নির্গিহিত হচ্ছে। পুরুষরা দাড়ি রাখলে টুপী পড়লে জামাতী বা মৌলবাদী নামে হেনস্থা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক এক্সপ্রেশনগুলোতে পৌত্তলিকতা, অবতারবাদ, প্রতীক পূজার জয়গান গাওয়া হচ্ছে। দেশের শিরায় শিরায় ভারতীয় রাজনীতি সমাজনীতি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ইসলাম অনুসারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। অথচ দেশের ৯০% মুসলমান একেই স্বাধীনতা মেনে নিয়ে, মহানন্দে উৎসবে মেতে রয়েছে। সকলেই চায় ক্ষমতার রাজনীতি করতে।

দেশের সংস্কৃতি দেশের হাড়ে ক্যান্সারের মত ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে, যে কোন মূহুর্তে দেশ ভেঙে পড়তে পারে, সে বিষয়ে কোন চেতনাই নেই। সংস্কৃতি হচ্ছে দেশের পতাকা। পতাকার রং বদল হলে যেমন স্বাধীনতা থাকেনা, তেমনি সংস্কৃতির রং বদল হলেও দেশ থাকেনা ।সংস্কৃতিই হল দেশের প্রাণ। সেই প্রাণকে মেরে দেশ বাঁচাবেন কি ভাবে?

লেখক: কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী ও প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

One Comment

Leave a Reply