সংবাদ শিরোনামগুলো
>>ডাকাত বা লুটেরারা বদমাইশ কিন্তু তাদের সর্দারনী নিষ্পাপ!>>শেখ হাসিনাও সৌজন্য শেখাচ্ছেন!>>শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে বললেন মির্জা ফখরুল>>৪ মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ বিবৃতি: গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন>>বিতর্কিত গণকমিশন ও ঘাদানিকের সাথে জড়িতদের আয়ের উৎস খুঁজতে দুদকে স্মারকলিপি>>লুটেরাদের ডলার লুটে টাকার মান কমল আরেক দফা>>আলেমদের বিরুদ্ধে তথাকথিত কমিশনের শ্বেতপত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতা- সর্বদলীয় ওলামা ইউকে>>আওয়ামী লুটেরাদের ডলার লুট>>শেখ হাসিনার অধিনে কেউ ভোটে যাওয়ার চিন্তা করলে ভুল করবে-শামসুজ্জামান দুদু>>অবশেষে গডফাদার খ্যাত হাজী সেলিম কারাগারে: কতটা দ্রুততায় জামিন মঞ্জুর হয় সেটাই দেখার বিষয়

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিকৃষ্ট

, ,

মাহমুদুর রহমান

মে মাসের তিন তারিখ ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’। ওই দিন প্যারিসভিত্তিক সাংবাদিক সংগঠন, ‘রিপোর্টার্স উইথআউট ফ্রন্টিয়ার্স’ সারা বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর এই বছরের শ্রেণিক্রম [র‍্যাংকিং] প্রকাশ করেছে। ১৮০টি দেশের উপর জরিপ করা সেই র‍্যাংকিং এ ২০২২ সালে বাংলাদেশের ১০ ধাপ অবনমন ঘটেছে। এর আগের বছরের ১৫২তম অবস্হান থাকে নেমে এবার বাংলাদেশ জায়গা পেয়েছে ১৬২ নম্বরে। কাহিনির এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্হান সবার শেষে। আলোচনা এগিয়ে নেয়ার আগে জরিপে এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর অবস্হান দেখে নেওয়া যাক। ভুটান ৩৩, নেপাল ৭৬, মালদ্বীপ ৮৭, শ্রীলংকা ১৪৬, ভারত ১৫০, আফগানিস্তান ১৫৬, এবং পাকিস্তান যথাক্রমে ১৫৭ নম্বরে স্হান পেয়েছে। বাংলাদেশে আওয়ামী ও ভারত সমর্থক, ইসলামোফোবিক সুশীল, সাংস্কৃতিক কর্মী ও তথাকথিত লিবারেল গোষ্ঠী তালেবান শাসিত যে রাষ্ট্র, আফগানিস্তানের নাম ঘৃনায় মুখবিকৃতি ছাড়া উচ্চারণ করেন না, সেই আফগানিস্তানের প্রেস ফ্রিডমে অবস্হান শেখ হাসিনার বাংলাদেশের পাঁচ ধাপ উপরে। গণতন্ত্রের প্রশ্নে যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেই পাকিস্তানও প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আজ বাংলাদেশের উপরে।

কিন্তু, এই পরিস্হিতিতে আমাদের কি আদৌ অবাক হওয়া সাজে? ইন্দো-মার্কিন সহায়তায় ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ফ্যাসিস্ট সরকার অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন, বিচার বিভাগ, সংসদ, সেনাবাহিনী’র মত চতুর্থ স্তম্ভ, সংবাদ মাধ্যমকেও কুক্ষিগত করে ফেলে। ভিন্ন মতের প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সব মিডিয়ার সম্পাদক, সাংবাদিকদের পুলিশ হেফাজতে ভয়াবহ নির্যাতন করার পর দীর্ঘ দিনের জন্য জেলে পুরে দেওয়া হয়। জুলুম সহ্য করতে না পেরে ভিন্ন মতের সাংবাদিকরা মারা গেছেন, অনেকে গুমের শিকারও হয়েছেন। এক শ্রেণির দালাল সাংবাদিক গোষ্ঠী সরকারের এই অমানবিক আচরণকে সর্বদা সমর্থন করেছেন। এবং তার বিনিময়ে ফ্যাসিজমের তেরো বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই মাসের তিন তারিখে সর্বশেষ প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স প্রকাশিত হওয়ার পর এদের অনেকে এখন গা বাঁচিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন। পত্রিকায় দেখলাম এই নিকৃষ্ট জাতেরই এক সম্পাদক, মন্জুরুল আহসান বুলবুল বলেছেন, ‘সাংবাদিকতা এখন পুকুরে কুমির ছেড়ে দিয়ে সাঁতার কাটতে বলার মত’। সত্য কথা হলো, এই সব সম্পাদক-সাংবাদিকরাই শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য নিজেরাই পুকুরে কুমির ছেড়েছেন। শুধু তাই নয়, সেই কুমিরগুলো যখন অসহায় সাংবাদিকদের ছিঁড়ে খেয়েছে, তখন বুলবুল গং পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে দিতে তামাশা দেখেছে। গতকাল শাপলা চত্বরের গণহত্যা দিবস গেছে। ২০১৩ সালে ৫ মে মধ্যরাতে শেখ হাসিনার নির্দেশে র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি এবং আওয়ামী ক্যাডাররা নিরস্ত্র আলেমদের উপর বাংলাদেশের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চালিয়েছিল। সেই গণহত্যার চিত্র ধারনের অপরাধে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছিল আওয়ামী সরকার। বুলবুলের মত সাংবাদিক নেতারা সেদিন মিডিয়ার টুটি টিপে ধরার নীতিকে সর্বতোভাবে সমর্থন জানিয়েছিলেন। গতকাল আমার দেশ ছাড়া আর কোন পত্রিকায় ৫ মে’র গণহত্যার কাহিনি প্রকাশিত হয় নাই। বাংলাদেশের ভিন্ন মতের সাংবাদিকদের করুণ অবস্হা বোঝানোর জন্য আমার দেশের সেই সংবাদের নীচে লেখা ইসলামিক টেলিভিশনের একজন ফটোজার্নালিস্টের কমেন্ট এখানে উদ্ধৃত করছি.

‘সেই রাতে আমাদের টেলিভিশন ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয় রাত আড়াইটায়। আমি ওই টেলিভিশনে ক্যামেরাম্যান ছিলাম। বর্তমানে বেকার, আর চাকরি হয়নি কোন টেলিভিশনে’।

বেকার জীবনের এই যন্ত্রনা নির্লজ্জ, সুবিধাবাদী আওয়ামী সাংবাদিকরা কোনদিন অনুভব করবেন না। সত্তর এবং আশির দশকে বাংলাদেশ দুই দুইবার সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে গেলেও সংবাদ মাধ্যমের এমন করুণ অবস্হা দেখতে হয় নাই। শেখ হাসিনার আমলের সংবাদ মাধ্যমের করুণ পরিস্হিতি কেবল তার পিতার বাকশালী শাসনের সাথে তুলনীয়। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবর রহমান একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠাকালে দেশের সকল সংবাদপত্রে তালা ঝুলিয়েছিলেন। কেবল চারটি পত্রিকা রাখা হয়েছিল শেখ পরিবার এবং বাকশাল সরকারের প্রচারের জন্য। যেহেতু সরকারী টেলিভিশন ছাড়া অন্য কোন ইলেনট্রনিক মিডিয়া সত্তরের দশকে ছিল না তাই বাংলাদেশ টেলিভিশন সরকারের একমাত্র ইলেকট্রনিক প্রচারযন্ত্রের কাজ করত। হাজার হাজার সাংবাদিক সেদিনও দু:সহ বেকার জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত: বাকশাল শাসন মাত্র কয়েকমাস স্হায়ী হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবের সরকারের পতন ঘটলে সংবাদ মাধ্যমের অমানিশা দূরিভূত হয়ে সাংবাদিকরা আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পেরেছিলেন। চিরকাল স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভুগতে থাকা বাংগালী মুসলমানের শেখ মুজিবের দু:শাসনের কথা ভুলতেও খুব বেশি সময় লাগে নাই। তাই এক নির্মম স্বৈরশাসক বাংলাদেশে আজ দেবতার মর্যাদায় আসীন। বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের অনুসারী এক শ্রেণির জনগোষ্ঠী যারা মুসলমান নামধারীও হতে পারেন, প্রতিদিন সকালে সেই স্বৈরশাসকের ছবি অথবা মুর্তি পুজা করে তবেই ঘর থেকে কাজে বের হন।

শেখ মুজিবের কন্যার আরো ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট শাসন দীর্ঘ তের বছর পার হয়ে গেলেও তার অবসানের কোন লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। জনগণ অতীষ্ঠ হলেও বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফলে গণঅসন্তোষকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়া সম্ভব হয় নাই। ২০২২ সালের প্রেস ফ্রিডম র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশের অবস্হান রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্হিতির প্রতিফলন মাত্র। বর্তমান সরকার তার অবৈধ শাসনকালের মেয়াদবৃদ্ধিতে সমর্থ হলে আগামী বছরগুলোতে অবধারিতভাবেই বাংলাদেশের অবস্হানের আরো অবনমন ঘটবে। আর মাত্র আঠারোটি দেশ বাংলাদেশের নীচে অবস্হান করছে। এই দেশগুলোর মধ্যে ওমান, জিবুতি, হন্ডুরাস, বাহরাইন, প্যালেস্টাইন, ভিয়েতনাম, কিউবা এবং ইরানে প্রেস ফ্রিডম সেই অর্থে না থাকলেও সে সব দেশে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্হিতি বাংলাদেশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক ভাল। আমি প্রকৃত তথ্য জেনেই এমন মন্তব্য করছি। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ পৃথিবীর ১৮০ টি দেশের মধ্যে এখনই ১৭০ নম্বরে আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো ১৮০ টি দেশের মধ্যে যে কোন বিষয়ের র‍্যাংকিংয়ে, কোন দেশ যখন ১৫০ এর নীচে নেমে যায়, এরপর তার আর নামার জায়গা থাকে না। জাতি হিসেবে আমাদেরও আর নামার জায়গা নাই।

লেখক: সম্পাদক, আমার দেশ    

Leave a Reply