সংবাদ শিরোনামগুলো
>>ডাকাত বা লুটেরারা বদমাইশ কিন্তু তাদের সর্দারনী নিষ্পাপ!>>শেখ হাসিনাও সৌজন্য শেখাচ্ছেন!>>শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে বললেন মির্জা ফখরুল>>৪ মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ বিবৃতি: গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন>>বিতর্কিত গণকমিশন ও ঘাদানিকের সাথে জড়িতদের আয়ের উৎস খুঁজতে দুদকে স্মারকলিপি>>লুটেরাদের ডলার লুটে টাকার মান কমল আরেক দফা>>আলেমদের বিরুদ্ধে তথাকথিত কমিশনের শ্বেতপত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতা- সর্বদলীয় ওলামা ইউকে>>আওয়ামী লুটেরাদের ডলার লুট>>শেখ হাসিনার অধিনে কেউ ভোটে যাওয়ার চিন্তা করলে ভুল করবে-শামসুজ্জামান দুদু>>অবশেষে গডফাদার খ্যাত হাজী সেলিম কারাগারে: কতটা দ্রুততায় জামিন মঞ্জুর হয় সেটাই দেখার বিষয়

ব্রেন ওয়াশিং মেশিন

, ,

আরিফুল হক

গত উপ-সম্পাদকীয়তে ভারতের বিজেপি আরএস এস দলের Racial hatred সম্বন্ধে কিছু কথা বলেছিলাম। আজ তাদের শিক্ষার নামে, মিথ্যা ইতিহাস লিখে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীর মন মগজে মুসলিম বিদ্বেষের বীজ ঢুকিয়ে, কি ভাবে তাদের উন্মত্ত করে তোলা হচ্ছে সে বিষয়ে কিছু কথা বলব।

কথাগুলো বলা জরুরী এই কারনে যে, ৯০% মুসলিম বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলামের এবং মিডিয়া কারিকুলামেও একইভাবে ভারতীয় বিজেপি আরএসএস পাঠ্যক্রম এবং ব্রেন ওয়াশিং যন্ত্র কাজে লাগানো হচ্ছে।

ভারতের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করে, ইতিহাস বিকৃতি ও তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে যেসব ভেজাল মনগড়া বইপত্র লেখা হয়েছে নিদর্শন স্বরূপ তারই একটির নমুনা তুলে ধরে দেখানোর চেষ্টা করবো যে বাংলাদেশ ও এই প্রচেষ্টার বাইরে নয়। বইটির নাম ‘বিলুপ্তির পথে হিন্দু’, লেখক ফা-হিয়েন।

মাইকেল হার্টের ভাষায়, মানুষের শ্রেষ্ঠ মানুষ- হজরত মোহাম্মদ (সঃ) সম্বন্ধে ‘বিলুপ্তির পথে হিন্দু’ বইটিতে লেখা হয়েছে—

“অসাধারণ বিচক্ষণ বুদ্ধিমান পয়গম্বর হযরত মুহম্মদ (সঃ) (৫৭০-৬৩২ খৃঃ) তৎকালীন আরব দেশের বিভিন্ন মূর্তিপূজক পরস্পর বিবাদমান বেদুইন গোষ্ঠীগুলোকে সংঘবদ্ধ করে তাঁর প্রবর্তিত একেশ্বরবাদ ‘ইসলাম’ ধর্মের অধীনে আনেন। তাদেরকে সংঘটিত করে এক দুর্ধর্ষ মিলিটারি যুদ্ধবাজ জাতিতে পরিণত করেন। এই অশিক্ষিত, নির্দয়, নিষ্ঠুর, বেদুইন গোষ্ঠীগুলোকে সুসঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাদের প্রয়োজন সাপেক্ষে কোরান (আল্লার বানী) ও হাদিস রচিত হয়। তারপর তারা তরবারি হাতে দেশদেশে ধর্মবিজয় অভিযানে, সম্পদ ও নারীলুন্ঠনে বেরিয়ে পড়ে। পৃথিবীতে এই সর্বপ্রথম যুদ্ধকরে ধর্ম প্রচারের যাত্রা। ধর্ম প্রচারের নামে, ঈশ্বর (আল্লার) নামে অন্য জাতির ওপর হত্যা সম্পদ ও নারীলুন্ঠনকে অভিধা দেওয়া হল ‘জিহাদ’। এই জিহাদের সৈনিকরা ইহকালে লুন্ঠিত নারীভোগ তে করছেই, পরকালেও তাদের জন্য স্বর্গে চিরযৌবনবতী সুন্দরী ‘হুরি’ ভোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে (প্রতিজনের জন্য ৭০জন হুরি) কি চমৎকার ব্যবস্থা”(পৃষ্ঠা-১৪)।

বইটিতে আরও বলা হয়েছে, “আরব মরুভূমির দেশ। খাদ্যের জন্য পশুহত্যা ওদের নিত্য কর্ম। তাই ওরা নির্মম, নিষ্ঠুর, নির্দয় মায়া-মমতাহীন। হত্যা করতে ওরা কাতর হয়না। হযরত মুহম্মদ (সঃ) ও তেষট্টিটি উট একসঙ্গে কোরবানি দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধবন্দী ৮০০ জনের শিরশ্ছেদ পরিচালনা করেছিলেন। মুসলিম চরিত্রের এই নিষ্ঠুরতার বাস্তব প্রমান ভারতের ফৌজদারি আদালত। খুন, ডাকাতি, চুরি, নারীধর্ষণ, নারীলুন্ঠন, চোরাচালান, কেসের আসামী ৯৯% মুসলমান। স্মাগলার, মাস্তান, গুণ্ডা, সন্ত্রাসীর (যেমন মুম্বাইয়ের দাউদ ইব্রাহিম, পশ্চিমবঙ্গের রশিদ খান) ইত্যাদির ৯৯% মুসলমান”।

সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যও কিছুটা জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। এই অন্ধ লেখকের সামান্যতম ইতিহাস জ্ঞান থাকলে কি, পৃথিবীর সর্বস্বীকৃত মনুষ্যকুলশ্রেষ্ঠ মহামানব সম্পর্কে এমন জঘন্য মিথ্যা উচ্চারণ করতে পারতো? যিনি তাঁর অসাধারণ গুণাবলীর দ্বারা ইতোমধ্যেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীর দুর্লভ আসনে অধিষ্ঠিত আছেন তাঁর উচ্চতা সম্পর্কে এই মহামূর্খদের সামান্যতম জ্ঞান আছে বলে মনে হয়না।

হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) সম্বন্ধে বলতে গিয়ে মিঃ
জি সি ওয়েলস বলেছেন ‘আরবদের ভিতরদিয়ে মানবজগৎ তার আলো ও শক্তি সঞ্চয় করেছে— ল্যাটিন জাতির ভিতর দিয়ে নহে’।
সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমার আশা হয় অদূর ভবিষ্যতে সমস্ত দেশের শিক্ষক ও প্রাজ্ঞ মণ্ডলীকে সম্মিলিত করে কোরানের মতবাদের উপর ভিত্তিস্থাপন করে জগতে একতামূলক শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব। কারন ইসলামই একমাত্র সত্য এবং মানবকে সুখ ও শান্তির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম’।

হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) সম্বন্ধে গুরু নানক বলেছেন, “বেদ ও পুরানের যুগ চলে গেছে, এখন দুনিয়াকে পরিচালিত করার জন্য কোরানই একমাত্র গ্রন্থ। মানুষ যে অনবরত অস্থির এবং নরকে যায়, তার একমাত্র কারন এই যে, ইসলামের নবীর প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা নাই”।
স্বামী বিবেকানন্দ তার ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ বইতে লিখেছেন, “ইউরোপের উদ্দেশ্য সকলকে নাশ করে আমরা বেঁচে থাকব, আর্যদের উদ্দেশ্য সকলকে আমাদের সমান করবো,…. দেখা যাবে ইসলাম যেথায় গিয়েছে সেখানেই আদিম নিবাসীদের রক্ষা করেছে”।
খৃষ্টান, শিখ, হিন্দু ধর্মানুসারী মহান ব্যক্তিবর্গ যেখানে ইসলামী বিধান কে মানুষের মুক্তির একমাত্র বিধান বলে রায় দিয়েছেন সেখানে, ভারতের ‘রাম’ আর বাংলাদেশের ‘রামছাগল’ রা ইসলাম উৎসাদনের যজ্ঞে নিয়োজিত রয়েছে। যাইহোক, ফিরে আসি রামভক্তদের উক্ত মিথ্যায় সাজানো বইটির কথায়।

বইটিতে সমস্ত মুসলিম শাসন যুগকেই বলা হয়েছে বর্বর যুগ। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ নবাব সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে বইটিতে লেখা হয়েছে- ‘১৭৫৭খৃ পলাশী যুদ্ধের কয়েকবছর আগে তরুণ সিরাজউদ্দৌলার কামনাসিক্ত লালসায় মুর্শিদাবাদের হিন্দু যুবতীরা ভাগীরথীতে স্নানে যেতনা। শিরাজ ও তার অনুচরেরা নৌকায় করে ঘুরে বেড়াত, আর তার পছন্দমত কোন যুবতীকে ঘাট থেকে নৌকায় তুলে নিত।রানী ভবানীর যুবতী কন্যাকে নিয়ে শিরাজ কি কান্ড করেছিল তাতো ঐতিহাসিকরা লিখে রেখে গেছেন”। বইটিতে লেখা হয়েছে “ নাটোরের রানী ভবানী নিজ কন্যাকে বহুদূরে গোপনে লুকিয়ে রেখে সিরাজের কামলালসার হাত থেকে কন্যাকে রক্ষা করেন” (পৃ২৭)।

অথচ সত্য ইতিহাস হল, নবাব সিরাজউদ্দৌলাই রানী ভবানীকে নাটোরের জমিদারি দান করেছিলেন। কৃতজ্ঞতাবশত রানী ভবানী (হিন্দু রীতি অনুযায়ী) নবাবকে আপন কন্যা উপঢৌকন দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নবাব গ্রহণ করেননি।

সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে আমি যতদূর পড়াশুনা করে জানতে পেরেছি তাহলো, সিরাজের নানা আলিবর্দি খান ইন্তেকাল করেন ১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল, আর পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতন ঘটে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। মাত্র ১৪মাস ১৪দিন সিরাজ নবাব ছিলেন। এই ১৪ মাস ১৪ দিনই শুধু নয়, কিশোর বয়স থেকেই তিনি নানার আদেশে বর্গীদস্যু ও ইংরেজ দমনে সারা বাংলা ছুটে বেড়িয়েছেন। কখনও কখনও এমনও গেছে যে ঘোড়ার পিঠে তাঁকে রাত কাটাতে হয়েছে। তিনি ভাগীরথীতে নৌকা ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন কবে তা ঐ রাম ও রামছাগলরাই জানে।

এই রামবাবু আর রামছাগলের দল উপমহাদেশের গৌরবের ইতিহাসটিকেই কালিমালিপ্ত করে ফেলেছে। যেখানে যত উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ও মসজিদ আছে সবই নাকি তাদের পূর্বপুরুষদের স্থাপনা ও মন্দির।
বইটিতে বলা হয়েছে- অযোধ্যার রাম জন্মভূমির মন্দির ভেঙ্গেই নাকি তৈরি হয়েছিল ১৫২৮ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ। শাহজাহান কর্তৃক তাজমহল নির্মাণ নাকি ইতিহাসের জালিয়াতি। বলা হয়েছে, তাজমহল সপ্তদশ শতাব্দীর কোন মুসলিম কবর নয়, তা দ্বাদশ শতাব্দীর এক প্রাচীন শিবমন্দির। যার নামছিল তেজোমহাল শিবমন্দির। এই তেজোমহাল থেকেই নাকি তাজমহল নাম।

আরও বলা হয়েছে, দিল্লীর লালকেল্লা ছিল পৃথ্বীরাজ চৌহানের প্রাসাদ ‘লালকোট’ আর দিল্লির জামে মসজিদ ছিল পৃথ্বীরাজের প্রধান বিষ্ণু মন্দির।

কুতুব মিনার ছিল, গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য নির্মিত মানমন্দির, এখানে বরাহমিহির জ্যোতির্বিদগণ রাতে আকাশের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করতেন।

আগ্রার দূর্গ ছিল হিন্দু সম্রাট পরমার্দিদেবের রাজধানী। ময়ূর সিংহাসন ছিল খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকে সংবৎ সাল প্রচলনকারি সম্রাট বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন। দেওয়ানই আম ছিল পৃথ্বীরাজ চৌহানের গৌরী শঙ্কর মন্দির, দেওয়ানই খাস ছিল জৈন্য আদিনাথ মন্দির।

ইতিহাস বিকৃতি ও তথ্য জালিয়াতির এমন নগ্ন দলিল পৃথিবীর ইতিহাসে আর আছে মনে হয়না।
এতক্ষণ তো রাম বাবু দের ব্রেন ওয়াশ যন্ত্রের কিঞ্চিৎ পরিচয় দিলাম।

এবার দেখি ৯৯% মুসলিম দেশের রামছাগলরা কিভাবে সেই মগজ ধোলাই যন্ত্র ব্যবহার করছে।

এতদিন জেনে এসেছি এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ (বুটি ফুডোসা) জন্মাতো বলে মোগল সুবাদার ইসলাম খান নামকরণ করেন ‘ঢাকা’। আজ শুনছি ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছে জঙ্গলঢাকা অবস্থায় এক দুর্গা মূর্তি পাওয়া যায়, এবং জনৈক সেখানে মন্দির গড়ার স্বপ্ন দেখেন এবং মন্দির গড়ে তোলেন। জঙ্গল ঢাকা অবস্থায় ঈশ্বর আবির্ভূত হন বিধায় মন্দিরটির নামকরণ করেন ঢাকা+ঈশ্বর অর্থাৎ ঢাকেশ্বরী মন্দির। এবং এই ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি। ঢাকেশ্বরী মন্দির এখন বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির।

বাহ কি সুন্দর সমাধান। শাখাপ্রশাখায় টানাটানির দরকার কি একেবারে মূলোৎপাটন। অর্থাৎ এদেশের মানুষের মগজে, ইতিহাস ঐতিহ্যের গোড়াতেই মূর্তি বা মন্দির সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেবার কি সুন্দর কারসাজি।

যে মানুষটার জন্য আজ স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে তার নাম মহম্মদ আলি জিন্নাহ। সেই জিন্নাহ হলের নাম বদল করে রাখা হয়েছে সূর্যসেন হল। যে সূর্যসেন ছিল গোঁড়া সাম্প্রদায়িক, মুসলমানদের স্বাধীনতা বিরোধী, এবং সন্ত্রাসী সর্দার। যেমন বীজ তেমনি ফসল।

আজ বাংলাদেশের মুসলমানরা মুসলমানি পোষাক পরতে গিয়ে হেনস্থা হচ্ছে। মেয়েরা হিজাব পরার কারনে উলঙ্গ হচ্ছে। বাড়ীতে আরবী কোরান ও অন্যান্য কিতাব রাখার কারনে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। আরএসএস বিজেপি শাসিত ভারতের মুসলমান নির্যাতন আর বাংলাদেশের মুসলমান নির্যাতনের মধ্যে পার্থক্য আছে কি? ব্রেনওয়াশিং মেশিনের খপ্পরে পড়ে, নিজের গড়া দেশটাতেই সংখ্যাগুরু মুসলমানরা আজ ‘সংখ্যা গ রু র’ মত নিষ্পেষিত হচ্ছে, অথচ হাম্বা হাম্বা করে প্রতিবাদ করারও ক্ষমতা নেই। এবং বুঝতেও পারছেনা যে এসবই ভারতের ব্রেন ওয়াশিং মেশিনের ফল।

লেখক: কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী ও প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

3 Comments

Leave a Reply