সংবাদ শিরোনামগুলো
>>ডাকাত বা লুটেরারা বদমাইশ কিন্তু তাদের সর্দারনী নিষ্পাপ!>>শেখ হাসিনাও সৌজন্য শেখাচ্ছেন!>>শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে বললেন মির্জা ফখরুল>>৪ মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ বিবৃতি: গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন>>বিতর্কিত গণকমিশন ও ঘাদানিকের সাথে জড়িতদের আয়ের উৎস খুঁজতে দুদকে স্মারকলিপি>>লুটেরাদের ডলার লুটে টাকার মান কমল আরেক দফা>>আলেমদের বিরুদ্ধে তথাকথিত কমিশনের শ্বেতপত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতা- সর্বদলীয় ওলামা ইউকে>>আওয়ামী লুটেরাদের ডলার লুট>>শেখ হাসিনার অধিনে কেউ ভোটে যাওয়ার চিন্তা করলে ভুল করবে-শামসুজ্জামান দুদু>>অবশেষে গডফাদার খ্যাত হাজী সেলিম কারাগারে: কতটা দ্রুততায় জামিন মঞ্জুর হয় সেটাই দেখার বিষয়

হাসিনার প্ল্যান-এ বাস্তবায়ন শুরু

, ,

মাহমুদুর রহমান

এই সপ্তাহে আদালত পাড়ার দুটো গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে। বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা খন্দকার মোশাররফের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার উপর যে দীর্ঘদিনের স্থগিতাবস্হা ছিল সেটা সুপ্রীম কোর্ট উঠিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ শেখ হাসিনা চাইলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপির অন্যতম শীর্ষ এই নেতাকে সাজা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিতে পারেন। দ্বিতীয় খবরও দুদক সংক্রান্ত। বিরোধীদের সায়েস্তা করে ফ্যাসিস্ট শাসন টিকিয়ে রাখতে শেখ হাসিনা বিএনপি আমলে সৃষ্ট এই প্রতিষ্ঠানটিকে খুবই কার্যকরভাবে গত তেরো বছর ধরে ব্যবহার করছেন। জিয়া পরিবারের প্রায় সকল সদস্যের বিরুদ্ধেই দুদক মামলা দিয়ে রেখেছে। এমনই এক বানোয়াট মামলার ফলেই সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে প্রচন্ড অসুস্হ বেগম জিয়া আজ গৃহবন্দি। এমনকি বেগম জিয়ার ছোট ভাই শামিম ইস্কান্দার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। সেই মামলার স্থগিতাদেশ বাতিলের আবেদন নিয়ে সরকার উচ্চ আদালতে গেছে এবং ধারনা করছি খুব শীঘ্রি বিচার শুরু হয়ে যাবে। এবার ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করব কেন সরকার এখন এই উদ্যোগ নিচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রি আবদুল মোমেন এই মাসেই ওয়াশিংটনে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেটের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করে এসেছেন। সেখানকার সূত্র অনুযায়ী মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পরিষ্কার করেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশে আর একটি ভুয়া নির্বাচন দেখতে চায় না। এই কারণেই আবদুল মোমেন সেক্রেটারি ব্লিংকেনের কাছেই আবদার করতে বাধ্য হয়েছেন যেন তিনি বা তার সরকার ২০১৮ সালের মত বিএনপিকে আবারও নির্বাচনে ধরাশায়ি করবার জন্য এনে দেয়। মার্কিন সরকার হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসন দীর্ঘায়িত করতে বিএনপির উপর এই ধরনের কোন অন্যায় চাপ প্রয়োগ করতে সম্মত হবে বলে অবস্হাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, দক্ষিন এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের একচ্ছত্র ভূমিকা ওয়াশিংটনের আর মন:পুত নাও হতে পারে। প্রায় দুই দশক ধরে এই অঞ্চলে ভারতীয় দাদাগিরিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ প্রকৃতপক্ষে ক্ষুন্ন হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৪ সালের একদলীয় নির্বাচনকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা নয়া দিল্লিতে ছোটাছুটি করেও সেই নির্বাচন আটকাতে পারেন নাই। দক্ষিন এশিয়ায় ঘোষিত কৌশলগত মিত্র ভারতের মন রক্ষার্থে সেবার বাংলাদেশে গণতন্ত্রের দাফন ওয়াশিংটন মেনে নিয়েছিল। গত এক দশকে দক্ষিন এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্হিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনকে উপেক্ষা করে ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তিনি একদিকে ইন্দো-মার্কিন লবির সহায়তায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি থেকে প্রচুর ঋণ পেয়েছেন, আবার অপরদিকে চীনের কাছ থেকেও বিপুল অর্থ নিয়ে শেখ পরিবারের পকেট ভারি করেছেন। চীনের অর্থলগ্নিতে বাংলাদেশ ঋণগ্রস্হ হওয়ার বিনিময়ে হাসিনার শ্রীবৃদ্ধি হলে ভারতও আপত্তি জানায় নাই। ইসলামোফোবিয়াকে পুঁজি করে শেখ হাসিনা সব কুলের সাথেই যে লাভের ব্যবসা খুলে বসেছিলেন, ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তনের ফলে তাতে যে বিঘ্ন ঘটতে চলেছে সেই অশুভ বার্তা নিয়েই আবদুল মোমেন ঢাকায় ফিরেছেন।

বাংলাদেশের জনগণ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে যুগের পর যুগ পিষ্ট হলেও চীন কিংবা ভারতের কিছু যায় আসে না। চীন নিজেই স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় অন্য দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ইত্যাদি নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নাই। ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও মুসলমানের কোন অধিকার আছে তা মানতে নারাজ। সেই ১৯৭১ সাল থেকেই নয়া দিল্লি বাংলাদেশকে আশ্রিত রাজ্য বলেই মনে করে। তাই শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজনে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন চালায় তাতে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদি সরকার সমর্থনই জোগাবে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্হিতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক সমস্যা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশটি কেবল যে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক তাই নয়, ভূরাজনৈতিক কারণে তাকে সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলতে হয়। তদুপরি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী দিয়ে ‘Regime Change’ এবং পরবর্তিতে হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ওয়াশিংটনের বিশেষ দায় আছে। তাদের সমর্থনেই ভারত সরাসরি হস্তক্ষেপ করে শেখ হাসিনাকে ২০০৮ সালের সাজানো নির্বাচনে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তেরো বছর ধরে সেই দায় বহন করবার পর বাইডেন প্রশাসন এবার নিষ্কৃতি চাইতে পারে। সুতরাং, কোন না কোন প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে না পারলে পশ্চিমা জোটভূক্ত দেশসমূহ সেই নির্বাচনকে বৈধতা দেবে না। বাংলাদেশে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের দুই দফার নির্বাচনী তামাশা সমর্থন করা এবং তার পুনরাবৃত্তি মেনে নেয়া গণতান্ত্রিক বিশ্বের পক্ষে আর সম্ভব নয়। অতএব, যে কোনভাব বিএনপিকে ২০২৩ সালের নির্বাচনে আনার প্ল্যান-এ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই শেখ হাসিনার নির্দেশে দুদক খন্দকার মোশাররফ ও সাইদ ইস্কান্দারের বিরুদ্ধে মামলা চালু করছে বলেই আমি মনে করি।

এই আদালতকে ব্যবহার করেই শেখ হাসিনা বেগম জিয়াকে জিম্মি করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের প্রচলিত আইন অগ্রাহ্য করে আদালত সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে খালেদা জিয়াকে জামিন না দেয়াতেই তার ভাইবোনেরা মানবিক কারণে হাসিনার দ্বারস্হ হতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার প্রশাসনিক নির্দেশে অন্তত নিজ বাসায় থেকে গুরুতর অসুস্হ বেগম জিয়া চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। সেই প্রশাসনিক নির্দেশ শেখ হাসিনা চাইলেই যে কোন মুহূর্তে প্রত্যাহার করতে পারেন। আমি নিশ্চিত যে, প্ল্যান-এ বাস্তবায়নের কোন এক পর্যায়ে বিএনপির উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এই অমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ স্বৈরশাসক কোনরকম দ্বিধা করবে না। বেগম জিয়ার ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে শেখ হাসিনা সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। এই ভাই কার্যত গৃহবন্দি বেগম জিয়াকে দেখাশোনা করে থাকেন। তার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হলে স্বাভাবিকভাবে বেগম জিয়াও অস্হির হয়ে উঠবেন। একদিকে বিভিন্ন উপায়ে চাপ প্রয়োগ এবং অন্যদিকে কিছু আসনে জেতানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপিকে ২০২৩ এর পাতানো নির্বাচনে এনে আরো পাঁচ বছরের জন্য স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করাই শেখ হাসিনার লক্ষ্য। আশা করছি ২০১৮’র ভুলের পথে বিএনপি হাঁটবে না। সেবারও গুজব ছিল যে, সন্মানজনক আসনপ্রাপ্তির আশ্বাস দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা হয়েছিল। নির্বাচনকালিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করতে বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর দ্বিধা এবং সময়ক্ষেপন শেখ হাসিনাকে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় এবং সুযোগ করে দিচ্ছে। এই অবস্হায় বিএনপিকে হয় দ্রুত চূড়ান্ত আন্দোলনে নামতে হবে অথবা অধিকতর বৈরি পরিস্হিতি মোকাবেলার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, আমার দেশ

3 Comments

Leave a Reply